WB BUDGET 2026- বাজারে পা রাখলেই কি পকেটে টান পড়ছে? ক্রমবর্ধমান মূল্যবৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার খরচের চাপে সাধারণ মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের যখন নাভিশ্বাস ওঠার জোগাড়, ঠিক সেই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে রাজ্য সরকারের ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষের বাজেট একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দলিল। একজন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকের দৃষ্টিতে দেখলে, এই বাজেট মূলত ‘পারচেজিং পাওয়ার’ (Purchasing Power) বা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানো এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে অর্থপ্রবাহ বজায় রাখার একটি পরিকল্পিত প্রয়াস।
WB BUDGET 2026
জনকল্যাণমূলক প্রকল্প এবং পরিকাঠামোগত সংস্কারের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে এই বাজেটে যে ৫টি বড় চমক দেওয়া হয়েছে, তা নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. লক্ষ্মীর ভাণ্ডার: গ্রামীণ অর্থনীতিতে চাহিদার সঞ্চার
এই বাজেটের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘোষণা হলো ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ প্রকল্পের মাসিক ভাতা ৫০০ টাকা করে বৃদ্ধি। এই বর্ধিত সুবিধা ফেব্রুয়ারি মাস থেকেই কার্যকর হচ্ছে। এই প্রকল্পের জন্য সরকার মোট ১৫ হাজার কোটি টাকার বিশাল একটি আর্থিক সংস্থান (Fiscal Allocation) করেছে।
“লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পের এই বরাদ্দ বৃদ্ধি কেবল একটি অনুদান নয়; এটি সরাসরি গ্রামীণ বাজারে চাহিদা (Consumer Demand) তৈরির একটি কৌশল। নারীর হাতে সরাসরি নগদ অর্থ পৌঁছালে তা তৃণমূল স্তরে ভোগব্যয় বৃদ্ধি করে, যা গ্রামীণ অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখতে সহায়ক হয়।”
২. ফ্রন্টলাইন কর্মীদের স্বীকৃতি: সিভিক ভলান্টিয়ার, আশা ও অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী
সমাজের একদম প্রান্তিক স্তরে সরকারি পরিষেবা পৌঁছে দেন যারা, সেই ফ্রন্টলাইন কর্মীদের জন্য বাজেটে বিশেষ সংস্থান রাখা হয়েছে।
- সিভিক ভলান্টিয়ার, গ্রিন পুলিশ, আশা কর্মী এবং অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী ও সহায়ক—সকলের মাসিক ভাতা ১০০০ টাকা করে বৃদ্ধি করা হয়েছে।
- সিভিক ও গ্রিন পুলিশদের ভাতার জন্য আলাদাভাবে ১৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।
- মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে, কর্মরত অবস্থায় কোনো অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীর অকাল মৃত্যু হলে তাঁর পরিবারের জন্য ৫ লক্ষ টাকা এককালীন ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
বিশ্লেষণ: অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বলয় (Social Safety Net) মজবুত করা অত্যন্ত জরুরি। এই ফ্রন্টলাইন কর্মীদের বেতন বৃদ্ধি মাঠপর্যায়ে জনস্বাস্থ্য ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার কাজে নিযুক্ত কর্মীদের মনোবল বৃদ্ধি করবে, যা দীর্ঘমেয়াদে জনপরিষেবার মানোন্নয়ন ঘটাবে।
৩. ‘বাংলার যুব সাথী’: বেকার যুবকদের জন্য সোশ্যাল সেফটি নেট
বেকারত্বের সমস্যার মোকাবিলায় সরকার ‘বাংলার যুব সাথী’ নামে একটি নতুন প্রকল্পের দিশা দেখিয়েছে। এই প্রকল্পের শর্তাবলী নিম্নরূপ:
- ২১ থেকে ৪০ বছর বয়সী মাধ্যমিক পাশ বেকার যুবক-যুবতীরা এর সুবিধা পাবেন।
- নির্বাচিতরা প্রতি মাসে ১৫০০ টাকা করে আর্থিক সহায়তা পাবেন।
- আগামী ১৫ আগস্ট থেকে এই প্রকল্প চালু করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে (শর্ত সাপেক্ষে, যদি বর্তমান সরকার পুনরায় ক্ষমতায় ফেরে)।
বিশ্লেষণ: একজন বিশ্লেষকের মতে, কর্মসংস্থানের দীর্ঘমেয়াদী সুযোগ তৈরি হওয়ার অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে এই ভাতা যুবকদের দক্ষতা বৃদ্ধি বা ছোটখাটো স্বনির্ভর উদ্যোগের প্রাথমিক পুঁজি হিসেবে কাজ করতে পারে। এটি বেকার যুবসমাজের মধ্যে একটি সাময়িক আর্থিক স্বস্তি বা ‘বাফার’ হিসেবে কাজ করবে।
৪. সরকারি কর্মচারীদের ডিএ (DA) বৃদ্ধি: মুদ্রাস্ফীতির বাজারে কি যথেষ্ট?
রাজ্যের অর্থ দফতরের প্রতিমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য সরকারি কর্মচারীদের জন্য ৪ শতাংশ মহার্ঘ ভাতা (DA) বৃদ্ধির ঘোষণা করেছেন। সপ্তম পে কমিশনের ঘোষণা করলেন রাজ্যের অর্থ দফতরের প্রতিমন্ত্রী চন্দ্রিমা।
বিশ্লেষণ: বর্তমান জাতীয় মুদ্রাস্ফীতির হারের (Inflation Rate) সঙ্গে তুলনা করলে এই ৪ শতাংশ বৃদ্ধি সরকারি কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসের গতিকে কিছুটা হলেও শ্লথ করবে। এটি একটি প্রয়োজনীয় ‘ফিসকাল রিলিফ’, তবে কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারীদের সঙ্গে ডিএ-র যে ব্যবধান রয়েছে, তা এই সামান্য বৃদ্ধিতে কতটা পূরণ হবে সেটি পর্যালোচনার বিষয়।
৫. শিল্প ও পরিকাঠামো: দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের রূপরেখা
কেবল নগদ সহায়তা নয়, রাজ্যের পরিকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থান তৈরির দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যও এই বাজেটে স্পষ্ট:
- কালচারাল সিটি: বারুইপুরে একটি সর্বাধুনিক ‘কালচারাল সিটি’ নির্মাণের প্রস্তাব।
- ইন্ডাস্ট্রিয়াল করিডোর: রাজ্যে ৬টি ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড ইকোনমিক করিডোর স্থাপনের পরিকল্পনা।
- শিল্প পার্ক: নতুন ৫টি ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক তৈরির ঘোষণা।
বিশ্লেষণ: ‘বাংলার যুব সাথী’ প্রকল্পের মাধ্যমে যে যুবকদের ভাতা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, তাদের স্থায়ী কর্মসংস্থানের পথ প্রশস্ত করতে পারে এই ইন্ডাস্ট্রিয়াল করিডোরগুলি। সামাজিক জনকল্যাণমূলক ব্যয় এবং পুঁজিগত ব্যয় (Capital Expenditure)-এর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা একটি রাজ্যের সামগ্রিক জিডিপি (GDP) বৃদ্ধির জন্য অপরিহার্য।

উপসংহার: আগামীর ভাবনা
২০২৪-২৫ অর্থবর্ষের এই বাজেট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরকার একদিকে যেমন সাধারণ মানুষের হাতে সরাসরি নগদ টাকা পৌঁছে দিয়ে ‘ডিমান্ড সাইড’ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে চেয়েছে, অন্যদিকে শিল্প করিডোর তৈরির মাধ্যমে বিনিয়োগের পরিবেশ গড়ার সংকেত দিয়েছে। তবে বড় প্রশ্নটি রয়েই যায়: এই বাজেট কি কেবল সাময়িক স্বস্তি ও নির্বাচনী চমক, নাকি এটি রাজ্যের দীর্ঘমেয়াদী স্বনির্ভরতা ও শিল্পায়নের পথ প্রশস্ত করবে? আপনার কী মনে হয়?





